দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যা


News Desk
দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যা
  • Font increase
  • Font Decrease

লোকটাকে সবাই ঘিরে ধরেছিল আর কেউ-কেউ বলছিল, বিদেশি-বিদেশি! কিন্তু কোন বিদেশের সেটা তার চেহারা দেখে আঁচ করা মুশকিল। হতে পারে ইউরোপীয় কিংবা মার্কিন, এমনকি ইরানি বা কাশ্মিরি ব্রাক্ষণও হওয়া সম্ভব। তখন কিছুকাল আগেকার কথা সুবর্ণদ্বীপের লোকেদের মনে পড়ে। দূর থেকে একটা লোককে দেখে তারা চিৎকার করেছিল বিদেশি-বিদেশি বলে। আবার অনেকেই চেঁচাতে থাকে ‘খিরিস্টান খিরিস্টান’ বলে। তারপর যখন দুপুর সকলের মাথার ওপরে হেলে পড়তে থাকে, লোকটা পকেট থেকে একটা গোলাকার টুপি বের করে মাথায় লাগিয়ে পশ্চিমমুখী নামাজ পড়তে শুরু করলে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে। শেষে জানা গেল লোকটা এসেছিল চেচনিয়া নামের একটা দেশ থেকে। চেচনিয়া বললেই আগে লোকে চিনতো না। কিন্তু দ্বীপের অনেকেই শিক্ষিত আর বিশ্ব এখন যখন সকলের হাতের মুঠোয় তারা জানে চেচনিয় নামের লোকেরা এককালের বিশাল এক সাম্রজ্যকে কাঁপিয়ে দিয়েছে ভয়ংকরভাবে। তাই তারা অপেক্ষা করে। তবে এই লোকটা ঠিক চেচনিয়টার মত নয়। সে বাংলা ভাষা জানে। অন্তত কাজ চালাবার মত কিছু শব্দ ও বাক্য তার জানা থাকায় সে তাকে ঘিরে ধরা লোকেদের স্মিত বলে, স্লামালেকুম, আপনাদের সকলের ওপর শান্তি বরষিত হউক। শ্মশ্রুমণ্ডিত মাঝবয়েসি বিদেশি লোকের মুখে নিজেদের ভাষা শুনে সুবর্ণদ্বীপের লোকেদের মনে হতে থাকে, লোকটা তাদের আত্মীয় না হলেও নিকটজন। যদি তা না-ই হবে সে দূরত্বকে ভাষা দিয়ে এতটা নিকটে আসবার কষ্টটুকু স্বীকার করতো না।

সুবর্ণদ্বীপে নদী বলতে ঐ একটাই কিন্তু তার নামোল্লেখ করা সহজ নয়। নদীর নাম বলাই যায়। ধরা যাক ধলেশ্বরী, ডাকাতিয়া, মেঘনা, পদ্মা, কর্ণফুলি, সোমেশ্বরী, কুশিয়ারা, গোমতী, গড়াই, খোয়াই, মুহুরি এরকম নদীর নাম। সেক্ষেত্রে নামোল্লেখের সঙ্গে-সঙ্গেই একটা জায়গা ভেসে উঠবে- একটা আয়তন তার মধ্যকার লোকজন তার প্রাচীন ও বর্তমান এইসব সঙ্গ-অনুষঙ্গ। ফলে, আমরা যে-শুরু করতে চাই সেই শুরুটা আর নিরেট শুরুতে স্থিত থাকবে না। নদী তো নদীই, চলমান। তা-ও সেই চলতে থাকা প্রবাহ তার দুই তীরে ভাঙনের ইতিহাস সত্ত্বেও পলি বা মাটির মত স্তূপ করে রেখে যায় কথা যে-কথা আবার হয়ে যায় কাহিনি। তাই নদীর নাম হোক রেণুকা। হ্যাঁ, এই নামের আড়ালে হয়তো পরিচিত নদীকে লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। হয়তো বাস্তবে তা-ই ঘটে। কিন্তু তাতে করে এটা অন্তত নিশ্চিত হওয়া গেল যে এই নদীর সূত্রে কোন বিশেষ অঞ্চল বা জায়গা ও তার মধ্যে নিহিত মানুষজন সম্পর্কে কারও পক্ষে কোন পূর্বধারণার আঁচ সম্ভব নয়। কিন্তু আড়াল কী আসলে করা যায়। হয়তো সংকীর্ণতাকেই আড়াল করা গেল নদীর নাম পাল্টে দিয়ে। এরই ফলে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতটাই বরং প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। কেননা, দ্বীপ এবং নদী বলতেই অরণ্য ও পাহাড় পটভূমি থেকে দূরে সরে গেল। লোকেরা ঠিকই দ্বীপ শব্দটিকে ধরে-ধরে একসময় বলবে, আপনি নদীর নাম বানিয়ে দিলেই কী আমাদের চোখে ধূলো দিতে পারেন, রেণুকা নদীর প্রকৃত নাম হলো এই!

এক অর্থে সব নদীর নামই তো দেওয়া নাম। নদী যদি তার নিজের নামকরণ নিজে করতে পারতো তবে কর্ণফুলি হয়তো কর্ণফুলি না হয়ে হতো নটরাজ কিংবা বুড়িগঙ্গা হতো রূপগঙ্গা। যে-নদীর নাম আমরা রেণুকা দিয়েছি, হতে পারে তার তীরের দীর্ঘ রেখাপথ ধরে গাছে-গাছে ফুটে থাকা ফুলের রেণু উড়তে থাকা হাওয়ায় ভাসমান সুবাস আর এই নদীর জলীয় গন্ধ মিলেমিশে এক আশ্চর্য উদ্ভাসন ঘটায়। সুবর্ণদ্বীপের লোকেরা যখন লোকটাকে ঘিরে ধরে তখন তার চেহারার ফর্সা রংটা কেমন পোড়া-পোড়া আর লালচে দেখায়। সেই লাল ঠিক সুস্থ লাল নয়, মনে হয় যেন অনির্ধারিত রক্ত এসে লোকটাকে লাল করে দিযেছে। অনবরত হাঁচি আর কাশি দিতে-দিতে লোকটার প্রাণান্তকর অবস্থা। দেখে অনেকেই ভয় পেয়ে যায়। মানুষ হাঁচি দেয়, কাশি দেয়, সুবর্ণদ্বীপের লোকেরাও দেয় হাঁচি-কাশি। কিন্তু এমন অনিঃশেষ হাঁচি-কাশির দৃশ্যের সঙ্গে তারা পরিচিত নয়। বিদেশি লোকটা তখন তার লালচে চেহারার লালচে চোখে নিকটের নদীর দিকে তাকায়। নদীর তীর ধরে একটানা গাছগুলিতে ফুটে রয়েছে ফুল। সেই ফুলেরাই আসলে তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটা বুঝতে পেরে ভেতরে ভেতরে সে আরও অসহায় বোধ করতে থাকে। এত-এত ফুল গাছেদের হত্যা করা মানে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। দেরিতে বুঝলেও হে-ফিভারের কবলে পড়া লোকটা তার সঙ্গে থাকা চামড়ার ব্যাগ থেকে একটা প্লাস্টিকের বাক্সে রাখা ট্যাবলেট গিলে খেয়ে নেয় ফ্লাক্স থেকে পানি ঢেলে নিয়ে। অল্পক্ষণের মধ্যে তার চেহারার অতিরিক্ত রক্তাক্ত ভাবটা কেটে গিয়ে মূল শ্বেত বর্ণ প্রকাশ্যে ফিরে এলে তাকে ঘিরে থাকা লোকেদের মধ্যেও একটা স্বস্তির ভাব ফিরে আসে। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা লোকের আকস্মিক হাঁচি-কাশি তাদেরকে লোকটার প্রতি কেন সহানুভূতিশীল করে তোলে সে-প্রশ্ন করে না কেউ। এদেরই কেউ হয়তো একটু আগে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করতে-করতে মেয়েমানুষটির মৃত্যু কামনা করে এসেছে। কিন্তু এখন তার মনে কত সহজেই জেগে উঠেছে সহমর্মিতার বোধ।

লোকটা বলে, তার নাম লুইগি, লুইগি পালোমার। যারা নামের চরিত্র সম্পর্কে খানিকটা ওয়াকিবহাল তারা হয়তো বলতো, লোকটা ইতালিয়, কিন্তু সে এসেছে মার্কিন দেশ থেকে যদিও ফ্রান্সের একটি ঔষধ কোম্পানিতে সে কাটিয়েছিল প্রায় এক দশককাল। সে যে ঠিক কোন্ দেশের নাগরিক সেটা তার পাসপোর্ট না দেখলে বা সে নিজে থেকে না বললে বোঝা দুরূহ। সেটা দেখেছে দেশের ইমিগ্রেশন অফিসার। সে এবং তাদের কেউ-কেউ জানে, লুইগি পালোমার আসলে কোন্ দেশের নাগরিক। লোকেরা তাকে ঘিরে ধরলেও তার গন্তব্য সম্পর্কে তারা সকলেই মোটামুটি নিশ্চিত হওয়াতে তাদের উৎসাহ-ঔৎসুক্য সীমা ছাড়িয়ে যায় না। সবাই লুইগিকে সাদরে প্রহণ করে। প্রথম দিকে যখন এরকম বিদেশিরা আসতো তখন তাদের ঘিরে-ধরা লোকেরা আচমকা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলতো, এট্টা ডলার দ্যান্ না বাবা! আগতর পকেটে আসলেই ডলার আছে কিনা, নাকি সব ডলারকে সে টাকায় পরিণত করে ফেলেছে সে-বিষয়ে নিশ্চিত না হয়েই তারা হামলে পড়ে ডলার কামনা করতো। এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। আগে ওদের একটুখানি স্থিত হতে দাও। আসুক ওরা, এসে ধাতস্থ হয়ে বসুক। থাকবার জন্যেই ওদের আসা। থাকলে তখন বলা যাবে, টাকা দাও কি ডলার দাও বা এটা দাও ওটা দাও। লুইগি আসলে একা আসে না। তার সঙ্গে থাকে সুবর্ণদ্বীপেরই এক লোক। লুইগি যখন চমৎকার নদীর তীরটা দেখবার জন্যে আগ বাড়ায় ততক্ষণে গোলাম কবির নামের সেই লোক বিস্কিট মুড়ি চানাচুর এরকম বেশকিছু শুকনো খাবার কিনে এনেছে প্যাকেটে ঝুলিয়ে। ততক্ষণে লুইগির হাঁচি-কাশির ভাবটাও আর নেই। দৌড়ে আসতে আসতে কবির বলে, কোন সমস্যা? সে তা বলে লুইগিকে কিন্তু বলবার সময় তাকায় লোকেদের দিকে। ফলে, লুইগি পালোমার এবং আগুয়ান লোকেরা প্রায় সমস্বরে উত্তর দেয়, না, না, কোন সমস্যা নাই।